ফিরবে কবে?

আমার অনেক কান্না পায়। কেঁদে ফেলি। গাল ভাসাই। খেলার ব্যাট ভেঙ্গেছে, কাঁদি। ফুটবলের বাতাস কমেছে, কাঁদি। আমার গ্লাসে টুকুনবাবু পানি খেয়েছে? কেঁদে ফেলি। কখনো কখনো পেন্সিলের মাথা ভাংলেও কাঁদি!

আমি আম্মুর বড় এক জ্বালা। কারণ আমার কান্না খুবই বিরক্তিকর। যে কারণেই শুরু হোক, এর শেষ হয়না সহজে। কেঁদেই চলি। যেখানে সেখানে শুরু হবার কারণে আম্মুকে ভীষণ বিরক্ত হতে হয়। একবার একজনের মৃত্যুদিবসে গেছি আম্মুর সাথে। আমার পাশে এক আন্টি। অসাবধানে আন্টির হাতের ব্যাগের এক কোণা লাগলো আমার হাতে। কাঁদার এই সুবর্ণ সুযোগ কেউ ছাড়ে? আমিও ছারলামনা। এমনি কান্না যে মিলাদ পড়াচ্ছিলেন যে হুজুর তিনিও মিলাদ পড়ানো ছেড়ে আমাকে মানে কান্নার উৎস খুঁজতে লাগলেন!

আম্মু আমাকে নিয়ে বেড়িয়ে এলেন সেখান থেকে, তারপর সে কি বকা! আমার কান্না আরো বাড়তে লাগলো! সাধারণত আমার কান্নার ভয়ে কেউ আমাকে বকেনা, আজ অনেকদিন পর কেউ বকা দিচ্ছে! আমি মনে মনে হাসি আর মুখে মুখে কাঁদি! ভয়ানক কান্না!

তো তারপর অনেকদিন হয়ে গেলো। আম্মুকে একদিন রাতে হঠাৎ আব্বু হাসপাতালে নিয়ে গেলো। আমাকে বললো মামনিকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাই। তুমি ফুফুর কাছে থাকো। ফুফু মানে আমাদের কাজের বুয়া। যাই হোক আমি তখন নতুন কেনা গাড়ি নিয়ে মহা ব্যাস্ত। আম্মু আব্বু কোথায় গেলো দেখার সময় নেই। আর এমনিতে আম্মুর পাশে ছাড়া না ঘুমালেও খেলতে খেলতে সেই রাতে কখন ঘুমিয়েছি টের পাইনি।

পরেরদিন সকালে উঠে খোঁজ পড়লো আম্মুর। মানে আম্মু তখনো ফেরেনি। আব্বুও না। ফুফু বললো দুপুরেই আসবে। তা শুনে কি আর আমার হয়? আমার আবার কান্না!

দুপুরে শুধু আব্বু আসলেন, আম্মু নেই। ততোক্ষণে আমার কেঁদে ঘর ভাসিয়ে গাড়ি ভাঙ্গা সারা! আব্বু আসতেই বললাম আম্মু কই? আব্বু বললো ডাক্তারের কাছে রেখে আসছি। তুমি চলো দেখাতে নিয়ে যাই। বললাম না আগে আরেকটা গাড়ি কিনে দাও, তারপর যাবো। আব্বু আমার কান্নার ভয়েই বোধহয় আমাকে নিয়ে আগে সোজা মার্কেটে গেলেন। লাল ইয়া বড় একটা গাড়ি কিনলাম। আমার খুশি দেখে কে?

তারপর গেলাম আম্মুকে দেখতে। দেখি নীল একটা শাড়ি পরে সাদা বিছানায় শুয়ে আছে। নাকে একটা সাদা পাইপ ঢোকানো। আর হাতে সুঁই লাগানো সাদা টেপ দিয়ে। আমি গাড়ি নিয়ে আম্মুকে ডেকে দেখালাম। আম্মু একটু হাসলেন। তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, বাবা তুমি আর কাঁদবানা। কাউকে জ্বালাবানা। একদম বিরক্ত করবানা কাউকে।   

আমি শুধু বললাম তুমি কবে আসবা আম্মু বাসায়? আর কতোক্ষণ ডাক্তার দেখাবা? চলো না বাসায় বাসায়? আব্বু বল বাবা এখুনি যাওয়া যাবেনা তোমার আম্মুর। আমার তো আবার সেই কান্না শুরু! আম্মু দেখি কেমন করে তাকালেন। তারপর বাসায় আসলাম আব্বুর সাথে।

তারপর আর আম্মু বাসায় আসেনি। দু’দিন কাঁদার পর একদিন দেখি বাসায় অনেক লোক এসেছে। সবার মাথায় টুপি, গায়ে পাঞ্জাবি। একটু পর একটা গাড়ি আসলো লাল বাতি জ্বালিয়ে। এমন গাড়ি দেখে আমার কি খুশি! সবাই কেমন করলো আমার সাথে। কাছে যেতে দিলোনা গাড়িটার। একদম না।

মামনি সেদিন তোমাকে অনেক পরে দেখতে দিয়েছিলো আমাকে। আমি কি যে বুঝেছিলাম জানিনা। ফুফু আমাকে বলেছিলো আমি কাঁদি জন্যই নাকি তুমি অনেক দূরে গেছ আমাকে ছেড়ে। তাই যখন তোমাকে সাদা কাপড়ে ফিরে আসতে দেখে আবার কেঁদে ফেলেছিলাম। কিন্তু ফুফু বললো মানুষ নাকি অভাবেই দূরে যায়। আর আমি নাকি আরো কাঁদলে তুমি আর কখনোই ফিরবেনা!

মামনি জানো সেদিনের পরে আর একটুও কাঁদিনি আমি। পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েও না, সত্যি। কাউকে জ্বালাইনি, বিরক্ত করিনি। একটুও না। তবু তুমি ফিরে আসোনা কেনো? আর কতদিন না কাঁদলে তুমি ফিরবে? ফুফু বলেছে তুমি নাকি তারা হয়ে গেছো! ওইতো তোমাকে দেখতে পারি। তুমি আমাকে দেখতে পারোনা? শুধু দিনে দেখতে পারোনা, তাই না? আমি দেখেছি দিনের বেলা তারা গুলো দেখাই যায়না। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি দিনেও কাঁদিনি। তাহলে তুমি ফেরোনা কেনো? মামনি তুমি কবে আমাকে আবার বুকে নিয়ে ঘুমাবে? ও মামনি, কবে ফিরবে তুমি?

6 thoughts on “ফিরবে কবে?

মন্তব্য প্রদান করুন ...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s