২টি বাস্তবতা যার মুখোমুখি ছিলাম আমি!

বাস্তবতা, কথাটি অনেক শুনতে অনেক সহজ মনে হলেও আসলেই কতটা সহজ তা যে এই বাস্তবতায় পড়ে সে-ই বুঝতে পারে, তা নতুন করে বলবার নাই। আসলে আমরা সবাই ছোট ছোট বাস্তবতার সাথে জড়িত সবসময়ই। কিন্তু, সেইসব বাস্তবতা যেগুলোর জন্য মানুষের জীবন জীবিকা নির্ভর করে সেগুলো কি আমরা সবাই ফেস করি? উত্তর অবশ্যই হবে- “সবাই না”! এটাই স্বাভাবিক।

বাস্তবতা একঃ

গত পরশু দিন(২৪/০১/২০১২) শহরের(রংপুর) কাচারী বাজার এলাকায় গিয়েছিলাম মাজেদুল ভাইয়ের সাথে রংপুর ওয়েব এর নতুন সংস্করনের প্রকাশনা নিয়ে কথা বলতে। প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষার পর মাজেদ ভাই আসলেন। কিন্তু, এই ২০ মিনিটের মাঝেরই ঘটে গেল প্রথম বাস্তবতা!

স্বভাবতই সন্ধায় আমার চা পান করবার নেশা। তাই মাজেদ ভাই যেহেতু লেট করছিনে আমি এই ফাকেঁ পিয়াসী রেস্টুরেন্ট এ ঢুকে চা খেলাম তারপর রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়ালাম। হঠাতই কেন যেন চোখ চলে গেল রেস্টুরেন্টের খাবার প্রস্তুতকারকের দিকে। উনি কেন জানি বার বার ভিতরের ক্যাশ কাউন্টারের দিকে দেখছিলেন। আমার কিছুটা সন্দেহ মনে হলো তাই আঁড়চোখে দেখছিলাম ঘটনা কি হতে পারে। ওয়েটার এসে নাস্তা নিয়ে যাচ্ছিল আর সেই লোকটি কিছু একটার সুযোগ খুজছিলেন হয়তো, এমন ধারনা হচ্ছিল আমার। এভাবে কয়েকবার হবার পর আমার সন্দেহ প্রমাণিত হলো। সে লোকটি সুযোগ বুঝে পাশে ট্রে-তে রাখা একটি গরম সবজি রোল নিয়ে মুখে পুড়লেন! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। এটি কেমন হলো?

প্রিয় পাঠক হয়তো অনেকেই বলবেন, এটাতো অনেকখানেই হয়, তাহলে নতুন কি? আসলে নতুন বলতে আমি বলবো, আমরা যাদের দিয়ে কাজ করায় নিই তাদের কি কোন অধিকার নেই সেগুলো ছুয়েঁ দেখার? খেয়ে তার স্বাধ নেবার? হয়তো বলবেন, তারাতো টাকা দিয়েও কিনে খেঁতে পারে। আমি বলবো যদি তাদের সামর্থ থাকতো তাহলে কি এভাবে সুযোগ বুঝে গরম একটি খাবার পুরোটাই একবারেই খেয়ে ফেলতো? অন্তত্য যাদের সামর্থ থাকে কোন কিছু কিনে নেবার বা অর্জন করে নেবার, তারা কখনও এমন করবে ভাবতে পারেন?

তখনই মনে হলো যে মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে নেই। কিন্তু, আমার মন বাধা দিলো। থাকনা, কি দরকার ছবি নেয়ার। হয়তো তার ক্ষুধার তাগিদে বা অন্যদের খেতে দেখে লোভ সামলাতে না পারার কারনেই এমনটা করতে বাধ্য হয়েছেন। ছবি তুলতে গেলেই হয়তো তিনি বিব্রত হতেন। হয়তো অপমানিত বোধ করতেন।

শুধু একপলক তাকিয়ে দেখলাম, তিনি খাবারটি পুরোটাই খেয়ে নিলেন নিমিষেই। আর তারপর নিজেই মুচকি হাসি দিলেন। সে হাসিটি কেমন জানেন পাঠক? অনেক খাবার চুরি করে খাবার পর নিজের অনুতপ্ততার! নিলাম। শুধুই পেটের দায়! জানি আমার এখানে করার কিছুই নাই। আমি শুধু তাকিয়ে দেখছিলাম, তার কিছুক্ষণ পর মুখ ফিরিয়ে নিলাম।

বাস্তবতা দুইঃ

গতকাল(২৫/০১/২০১২) বিকেলের দিকে বাপ্পি(আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড ইভার)’র বাসা(পর্যটন পূর্ব পাড়া)’য় গিয়েছিলাম এর নেট কানেকশনের সমস্যার সমাধান করতে। কাজ শেষ করে বাসায় ফিরার জন্য রিক্সা খুঁজছিলাম। একজনকে পেলাম বাট উনি টেক্সটাইল মোড় পর্যন্ত আসলেও আমার বাসার এরিয়া পর্যন্ত আসবেন না। আর বাপ্পির নতুন বাসা শহর থেকে মোটামুটি ভিতরে বলা চলে। ওখানে থেকে সন্ধার পর রিক্সা পাওয়াটা একটু কষ্ঠই বটে। তাই না পেরে উনার রিক্সায় চড়ে টেক্সটাইল পর্যন্স আসলাম।

মাঝে মাঝে রিক্সাওয়ালাদের উপরে এতটাই মেজাজ খারাপ হয় যা মুখে বলেও প্রকাশ করা যায় না। বিশেষ করে যখন তর্ক করে। যাক সেদিকে যাবো না। আমি টেক্সটাইল মোড়ে নেমে রিক্সাওয়ালাকে টাকা দিতে মানি ব্যাগ বের করলাম। তিনি বললেন-

“কি করেন ভাই?”
ক্যান, দেখেন না কি করি? টাকা বের করতেছি।
(তার একথা শুনে একটু সন্দেহ হলো, এমন কথা কেউ কোন দিনও বলে নাই। এইলোক এবার ছিনতাইকারী কি না!)
৫টাকা ভাড়া বাট আমার কাছে খুঁচরা না থাকার কারনে দশ টাকার দিতে গেলাম উনি ভাড়া নেয় বাকীটা দিবে বলে। বাট উনি-
থাউক ভাই, ল্যাইগবার নায়।
লাগবে না মানে, কি বলেন?
না ভাই, আরে মুই ওটঠেকি এ্র্যাটে আসনুই। তোকাম আননু আরকি। টাকা দেওয়া লাগবার নায়।
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
বলেন কি? আসছেন ভাল কথা। আমাকেতো আপনি বহন করে নিয়ে আসছেন তাই না?
হ!থোন ভাই লাইগবান নায়।
রাখেন তো! অযাথা কি বলেন এসব। আপনি বহন করে নিয়ে আসছেন, তার পরিশ্রমিক আপনাকে নিতেই হবে।

পাঠক জানেন, তাকে জোড় করে ঐ ৫টাকা ধরিয়ে দেবার পর তার মুখের অবস্থা কেমন ছিল? আমি হয়তো গত ৬ মাসেও অমন তৃপ্তি পাইনাই কোন কাজেই। একটি মানুষ যে কিনা আমাকে প্রায় ১ কিঃমিঃ বহণ করে নিয়ে এসেও বলতে পারে ভাড়া দিতে হবে না। সে কতটুকু উদার মনের হতে পারেন কল্পনা করতে পারবেন? অন্তত আমার যদি সামর্থ থাকতো এধরনের ১টি মানুষকে হলেও হাসি-আনন্দে রাখতে চেষ্ঠা করতাম সবসময়।

উপরের দুটি ছোট বাস্তবতা! যা আমাকে অনকে সময় ধরে ভাবতে বাধ্য করছে। যাদের জন্য আজ আমি আমার সময় খরচ করে এই লিখাগুলো লিখছি, তারা আসলেই অনেক দুঃখ, কষ্ট করে জীবন অতিবাহিত করে। তারপরেও তারা বলতে পারে, ভাড়া দিতে হবে না। যারা ক্ষুধার তড়নায় অন্যের খাবার খেয়ে তার পরক্ষনেই অনুসোচনায় পড়তে পারে তারাই আসল মানুষ, তারাই আসল নায়ক জীবন ধারন করবার। আর আমরা? আমাদের অবস্থা কিভাবে অন্যের হক মেরে নিয়ে বড় হবো। কিভাবে অন্যকে ছোট করতে পারবো সবার সামনে। এগুলো দিয়েই ব্যস্ত দিনভর! আসলেই কি আমরা মানুষ? প্রশ্নটি রেখে গেলাম। কেউ ইচ্ছা করলে উত্তর দিতে কার্পণ্য করবেন না।

আজ এ পর্যন্ত!

সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।

2 thoughts on “২টি বাস্তবতা যার মুখোমুখি ছিলাম আমি!

  1. তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে
    সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে।

    সত্য সত্য সত্য তোমার কথা
    এই বান্দা রাখবে তোমায় হৃদয় মাঝে যথা।

মন্তব্য প্রদান করুন ...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s